বিশ্ব হৃদদিবস উপলক্ষে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, হৃদরোগ এখন আর কেবল বয়স্কদের সমস্যা নেই। ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী পরামর্শক ডা. দেবাশীষ দেবনাথ টাইমস অব ইন্ডিয়ার কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং তামাক ও মাদক সেবনের কারণে তরুণদের মধ্যে করোনারি ধমনীর রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

তরুণদের হৃদরোগের ঝুঁকি কেন এত দ্রুত বাড়ছে?

আগে হৃদরোগকে মূলত বার্ধক্যজনিত সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ডা. দেবাশীষ দেবনাথের মতে, বর্তমানে মানুষের বসে কাজ করার প্রবণতা বা সিডেন্টারি লাইফস্টাইল সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। শারীরিক নড়াচড়া কমে যাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ হৃৎপিণ্ডের ওপর সরাসরি চাপ ফেলছে। প্রথম আলো আজ তাদের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে হৃদরোগের এই বাড়তি ঝুঁকি ও এর প্রতিরোধের বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, নিয়মিত ব্যায়াম না করা এবং দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকা—এই দুটি অভ্যাস মিলে রক্তনালিতে চর্বি জমার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করছে। ফলে তিরিশ বা চল্লিশের কোঠায় পা রাখার আগেই অনেকে হৃদরোগের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন।

ওজন কমাতে শুধু ক্যালরি গোনা কি আসলেই কাজে দেয়?

হার্ট সুস্থ রাখতে ওজন নিয়ন্ত্রণ জরুরি, তবে সেই ওজন কমানোর পদ্ধতি নিয়েও রয়েছে বড় বিভ্রান্তি। আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাময়িকী ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণার বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস জানিয়েছে, শুধু ক্যালরি কমিয়ে ওজন কমানোর চেয়ে খাবারের পুষ্টিগুণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ফল, সবজি, লাল আটার মতো পূর্ণ শস্য, বাদাম এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার খান, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। শুধু পরিমাণে কম খেয়ে পেট ভরানো আর শরীরের জন্য সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা এক কথা নয়। তাই পাতে কী রাখছেন, সেদিকে নজর দেওয়াটা ক্যালরি হিসাবের চেয়ে কোনো অংশে কম জরুরি নয়।

হার্ট সুস্থ রাখতে আজ থেকেই কোন অভ্যাসগুলো বদলাবেন?

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আইই বাংলা বিশ্ব হৃদদিবস উপলক্ষে প্রকাশিত তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভারী জিম সেশন বা দামি স্বাস্থ্য পরীক্ষার চেয়ে দৈনন্দিন কিছু সাধারণ অভ্যাসের পরিবর্তন হৃৎপিণ্ডকে অনেক বেশি সুরক্ষা দিতে পারে। আপনি কী খাচ্ছেন, দিনে কতটুকু হাঁটছেন বা নড়াচড়া করছেন, আর রাতে পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে কি না—এই তিনটি বিষয়ের ওপর সরাসরি নির্ভর করছে আপনার হৃদযন্ত্রের সুস্থতা।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম করা, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনির ব্যবহার কমানো এবং ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করা হৃদরোগ প্রতিরোধের প্রাথমিক ধাপ। রাতের ঘুম ৭-৮ ঘণ্টা নিশ্চিত করতে না পারলে শরীরের স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়, যা রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্ব হৃদদিবসে বিভিন্ন দেশের চিকিৎসক ও গবেষকদের এই সতর্কবার্তাগুলো একটাই বার্তা দিচ্ছে—হৃদরোগ প্রতিরোধে কোনো জাদুকরী ওষুধ নেই, আছে সচেতন জীবনযাত্রা। খাদ্যাভ্যাসে মানসম্মত পরিবর্তন এবং নিয়মিত শারীরিক সচলতা ছাড়া এই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সামলানো কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।