আমরা সবাই জানি যে মে মাস আসার সাথে সাথে আমাদের কাজের চাপ আগের থেকে অনেক বেশি বৃদ্ধি পায় । যা সাধারণ ভিষয় কিন্তু  

ভোরে ধান কাটা, পাটের বীজ বোনা, সবজি তোলা — সব একসাথে। এই ব্যাস্ততার মধ্যে অনেক কৃষক আছে যারা কিছু জরুরি কাজ ভুলে যান বা দেরি করে ফেলেন। আর সেই একটু দেরিতেই সারা বছরের কষ্ট গুলা সব নষ্ট হয়ে যায়।

গত বছর আমাদের এলাকায় এরকম হয়েছে। কয়েকজন কৃষক ভোরে ধান কাটতে তিনচার দিন দেরি করেছিলেন। ভেবেছিলেন আরেকটু পাকুক। সেই কয়েকদিনের মাথায় কালবৈশাখী এলো। সকালে উঠে দেখলেন অর্ধেক ধান মাটিতে পড়ে গেছে। সারা বছরের কষ্ট এক রাতেই সব শেষ।

আজকের এই লেখাটা তাদের জন্য যারা কৃষি কাজ করে অনেক কষ্ট করে নিজেদের সংসার চালান । মে মাসে ঠিক কী কী করতে হবে সেটা সহজ ভাষায় বলার চেষ্টা করলাম।

ভোরে ধান কাটতে দেরি করবেন না

ধান পাকার পর বেশিদিন মাঠে রাখলে দুইটা বিপদ হতে পারে।

 এক, হঠাৎ ঝড় বৃষ্টি এলে ধান মাটিতে পড়ে যায়। দুই, অতিরিক্ত গরমে ধানের ভেতরে চিটা বাড়ে, চাল ভাঙে বেশি।

ধানের শীষের ৮০ ভাগ সোনালি হলেই কাটা শুরু করুন। বাকিটা কাটার পরেই পেকে যাবে। আর কাটা ধান মাঠে ফেলে রাখবেন না। যেদিন কাটবেন সেদিনই বা পরেরদিন সকালের মধ্যে তুলে নিন।

মাড়াই করে ভালো করে রোদে শুকান। কমপক্ষে তিনচার দিন রোদ না দিলে গুদামে রাখার পর ধানের মধ্যে ছত্রাক ধরে, ফলে চাল হয় না ঠিকমতো।

পাটের বীজ বোনার সময় এখনই, পরে আর সুযোগ নেই

মে মাসের প্রথম দুই সপ্তাহ পাটের বীজ বোনার সেরা সময়। এই সময়ের পরে বোনা পাট ভালো হয় না, আঁশ কম পাওয়া যায়, দামও কম পাবেন।

জমি ভালো করে চাষ দিন। বীজ বোনার আগে ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন, তাহলে তাড়াতাড়ি গজায়। বিঘাপ্রতি ৭ থেকে ৮ কেজি বীজ লাগে।

অনেক কৃষক পাট চাষ ছেড়ে দিচ্ছেন কারণ আগে দাম পাননি। কিন্তু এই বছর পাটের চাহিদা বেড়েছে। পাটের তৈরি পণ্যের রপ্তানি বাড়ছে। তাই এবার চাষ করলে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

সবজি ক্ষেতে এখন চোখ রাখুন

মে মাসের গরম আর আর্দ্রতায় সবজি ক্ষেতে পোকামাকড় আর রোগবালাই হঠাৎ বেড়ে যায়। লাউ, কুমড়া, করলা, বেগুন এই সবজিগুলোতে এই সময়ে বেশি সমস্যা হয়।

প্রতিদিন একবার ক্ষেত দেখুন। পাতার নিচে সাদা বা হলুদ দাগ দেখলে বুঝবেন ছত্রাক বা ভাইরাস ধরেছে। কীটনাশক দেওয়ার আগে উপজেলা কৃষি অফিসে জিজ্ঞেস করুন। ভুল কীটনাশক দিলে ফসল আরও নষ্ট হয়, টাকাও যায় বেশি।

গরমে সেচের পানি নিয়ে সাবধান

মে মাসে রোদের তাপে মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়। অনেক কৃষক দেখেন ফসল হঠাৎ নেতিয়ে পড়েছে। এটা পানির অভাবে হয়।

তবে একটা ভুল অনেকে করেন। রোদের মধ্যে দুপুরবেলা সেচ দেন। এই সময় সেচ দিলে গাছের গোড়া পুড়ে যায়। সেচ দিন সকালে বা বিকেলে। গাছ পানি ভালো টানতে পারবে, ফলনও ভালো হবে।

কৃষক কার্ড না থাকলে এখনই বানান

অনেক কৃষক জানেন না যে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কৃষক কার্ড বানানো যায়। এই কার্ড থাকলে সরকারি ভর্তুকি মূল্যে সার ও বীজ পাওয়া যায়। বন্যা বা খরায় ফসল নষ্ট হলে সরকারি ক্ষতিপূরণও পাওয়া যায়।

কার্ড বানাতে শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র আর জমির কাগজ লাগে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কাছের উপজেলা কৃষি অফিসে একদিন গেলেই হয়ে যাবে।

আবহাওয়ার দিকে চোখ রাখুন

মে মাসে কালবৈশাখী ঝড় যেকোনো সময় আসতে পারে। আগে থেকে কোনো সংকেত পাওয়া যায় না বলে অনেক কৃষক প্রস্তুত থাকেন না।

রেডিও বা মোবাইলে আবহাওয়ার খবর প্রতিদিন দেখুন। ঝড়ের পূর্বাভাস পেলে সেদিনই ক্ষেতে গিয়ে দেখুন কিছু তোলার আছে কিনা। কলা গাছ, লাউয়ের মাচা এগুলো আগে থেকে একটু শক্ত করে বেঁধে রাখুন।

শেষ কথা যেটা বলি

মে মাস কৃষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাসগুলোর একটা। এই মাসে একটু সতর্ক থাকলে সারা বছরের পরিশ্রমের ফল ঘরে তোলা যায়। আর একটু অসতর্ক হলে সব মাটি।

নিজে সতর্ক থাকুন, পাশের কৃষককেও জানান।

এই লেখাটা কাজে লাগলে আপনার এলাকার কৃষকদের সাথে শেয়ার করুন।