প্যারিস, ফ্রান্স:

প্যারিসের ঐতিহাসিক সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে তুলুস, লিওঁ এবং মার্সেই—ফ্রান্সের প্রধান প্রধান শহরগুলোর রাজপথ এখন শিক্ষার্থীদের স্লোগানে মুখরিত। সরকারের প্রস্তাবিত নতুন শিক্ষানীতি সংস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে একযোগে রাজপথে নেমেছে দেশটির হাজার হাজার শিক্ষার্থী। গত কয়েক দশকের মধ্যে ফরাসি শিক্ষার্থীদের অন্যতম বৃহৎ এবং সংগঠিত আন্দোলন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্দোলনের নেপথ্য কারণ

চলতি আন্দোলন মূলত কয়েকটি মূল দাবিকে কেন্দ্র করে দানা বেঁধেছে:

 শিক্ষানীতি ও ভর্তি পদ্ধতির সংস্কার: উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের আনা নতুন নীতি এবং 'পারকোর্সাপ' (Parcoursup) নামক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়ার কঠোরতার প্রতিবাদ জানাচ্ছে ছাত্র সংগঠনগুলো। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই পদ্ধতি বৈষম্যমূলক এবং এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মানসম্মত উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে।

 আবাসন ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি: ফ্রান্সে মূল্যস্ফীতির কারণে শিক্ষার্থীদের আবাসন খরচ, দৈনন্দিন খাদ্যের দাম এবং যাতায়াত খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। 'ইউনেফ' (UNEF)-সহ প্রধান ফরাসি ছাত্র ইউনিয়নগুলোর মতে, অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী বর্তমানে পার্টটাইম কাজ করেও নিজেদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।

 শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই: রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ কমিয়ে আনার চক্রান্ত করা হচ্ছে দাবি করে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে শিক্ষক ও গবেষণা সুবিধার পর্যাপ্ত বরাদ্দের আহ্বান জানাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় অচলাবস্থা ও রাজপথের উত্তাপ

আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্যারিস, বোর্দো এবং রেন শহরের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন এবং প্রধান ফটক ব্লক করে রেখেছে শিক্ষার্থীরা। ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচি বা 'অকুপেশন' চালানো হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার প্যারিসের প্লেস দে লা রিপাবলিক থেকে শুরু হওয়া এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। প্লেকার্ড ও ব্যানার হাতে তরুণদের 'আমাদের ভবিষ্যৎ বিক্রি করা যাবে না' এবং 'শিক্ষায় বৈষম্য দূর করো' স্লোগানে কেঁপে ওঠে চারপাশ। মিছিলটি জাতীয় সংসদের অভিমুখে যাওয়ার চেষ্টা করলে বেশ কয়েকটি জায়গায় পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। জনতা ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে, তবে বড় ধরনের হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ছাত্রনেতা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

প্যারিসের অন্যতম প্রধান ছাত্র ইউনিয়নের মুখপাত্র বলেন, "আমরা শুধু একটি নীতি পরিবর্তনের জন্য রাজপথে নামিনি। আমরা আমাদের বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য লড়াই করছি। যখন একজন শিক্ষার্থীকে নির্ধারণ করতে হয় সে বই কিনবে নাকি রাতের খাবার খাবে, তখন বুঝতে হবে পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়েছে। সরকার আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত এই আন্দোলন থামবে না।"

অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, "শিক্ষার্থীদের মতামত ও উৎকণ্ঠাকে গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তবে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা বা শিক্ষা কার্যক্রম অচল করে দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়।" সরকার দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দিলেও আন্দোলনকারীরা এটিকে 'প্রহসন' বলে আখ্যা দিয়েছে।

আগামীর প্রভাব

ফরাসি ঐতিহ্যে ছাত্র আন্দোলনের একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। ১৯৬৮ সালের বিখ্যাত ফরাসি মে আন্দোলনের কথা মাথায় রেখে বর্তমান প্রশাসনও বিষয়টি নিয়ে বেশ সতর্ক। রাজপথে শিক্ষার্থী সংহতির সাথে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন শ্রমজীবী সংগঠন এবং শিক্ষক ইউনিয়নগুলোও সংহতি প্রকাশ করতে শুরু করেছে।

আসন্ন দিনগুলোতে ছাত্র সংগঠনগুলো আরও বড় ধরনের দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। যদি সরকার দ্রুত দাবিসমূহ মেনে না নেয়, তবে এই আন্দোলন ফরাসি রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আরও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।