কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশ বলছে, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় বাধা দেওয়ায় তাকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ অভিভাবকেরা। অপ্রতিম হত্যা নিয়ে আজ সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তীব্র বিক্ষোভ হয়েছে, পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে হত্যার পেছনের আসল কারণ ও দায় কার—তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক।
অপ্রতিম ছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে জানান, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে যে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল নামের তিনজন অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলে নিয়ে যায়। সেখানে তার কাছে থাকা আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরে তারা বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় মূল আসামিদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
শুধুই কি আইফোন, নাকি পেছনে আছে 'অসম বন্ধুত্ব'?
পুলিশের দেওয়া এই সরল ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। আজ দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। তাদের দাবি, একটি দামি ফোনের জন্য কেউ যদি কাউকে খুন করতে পারে, তাহলে সেই মানসিকতা তৈরি হলো কীভাবে? শিক্ষার্থীরা বলছেন, অপ্রতিম হত্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা গভীর সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। পুলিশের তদন্ত নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
তদন্ত যত এগোচ্ছে, আইফোনের বাইরেও কিছু অস্বস্তিকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হত্যার পেছনে রয়েছে মাত্র ৫ হাজার টাকার একটি ঋণ এবং দুই পক্ষের মধ্যে একটি 'অসম বন্ধুত্বের' সম্পর্ক। ১৩ বছরের একজন কিশোরের সঙ্গে তার চেয়ে বয়স্ক বা ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষের এমন সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হলো, কেনই বা ৫ হাজার টাকা এত বড় বিরোধের জন্ম দিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকে। পুলিশ শুরুতে বিষয়টিকে নিছক ছিনতাই হিসেবে দেখালেও, তদন্তের গভীরে যাওয়ার পর এই ক্ষোভ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসে।
অপ্রতিম হত্যার দায় কেন মা-বাবার ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে?
ঘটনার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেকেই হত্যাকারীদের চেয়ে বেশি দোষারোপ করছেন অপ্রতিমের মা-বাবাকে। তাদের বক্তব্য, এত দামি আইফোন কেন একটি ১৩ বছরের শিশুর হাতে দেওয়া হয়েছিল? বাবা-মা কেন সন্তানের গতিবিধির ওপর নজর রাখেননি? এই ধরনের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও সচেতন মহল। তাদের মতে, অপরাধীকে আড়াল করে শিকারের পরিবারকে দোষ দেওয়ার এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া দরকার। একটি শিশুর হাতে দামি ফোন থাকাটা কোনোভাবেই তাকে হত্যার বৈধতা দেয় না।
এদিকে, এই ঘটনা দেশের অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে বাবা-মায়েরা নিজেদের ভয়ের কথা জানাচ্ছেন। ইকবাল আহমেদ নামের একজন অভিভাবক একটি গ্রুপে লিখেছেন, "আচ্ছা, বাইকে যেভাবে জিপিএস ট্র্যাকার লাগায়, এইভাবে কি বাচ্চাদের শরীরেও লাগানো যাবে? হাতঘড়িতে বা অন্য কোনোভাবে! আমার সিরিয়াসলি ভয় ঢুকে গেছে।" তার এই পোস্টে অর্ধশতাধিক বাবা-মা একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। কেউ পরামর্শ চাইছেন, কেউ বা নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
কিশোর অপরাধ ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কী ভাবছে সমাজ?
অপ্রতিম হত্যার ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি আমাদের সমাজে কিশোর অপরাধ ও প্রযুক্তির অসম ব্যবহারের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। আইফোনের মতো দামি একটি ডিভাইস এখন অনেক ক্ষেত্রেই মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন কোনো কিশোর বা তরুণের কাছে এমন দামি জিনিস থাকে, তখন আর্থিক অসামঞ্জস্য থেকে ঈর্ষা বা ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের হাতে দামি প্রযুক্তি তুলে দেওয়ার আগে তাদের নিরাপত্তা এবং আশপাশের সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। তবে এর মানে এই নয় যে, দায় শিশুর বা তার পরিবারের। মূল দায় রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সমাজের।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলনে বলেছেন, অপ্রতিমের মতো আর কোনো শিশু যেন এমন নির্মমতার শিকার না হয়, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের। তারা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনা ও আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, গ্রেফতার হওয়া তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। তাদের রিমান্ডে এনে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ৫ হাজার টাকার ঋণ ও তাদের মধ্যকার সম্পর্কের গভীরতা নিয়েও তদন্ত হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রশ্ন, তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে কি না? কারণ, পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য আর পরবর্তীতে বেরিয়ে আসা তথ্যের মধ্যে যে অসামঞ্জস্য, তা সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বপন করেছে।
১৩ বছরের অপ্রতিম আর নেই। তার মায়ের কোল খালি। কিন্তু তার মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, তা এখন পুরো দেশের অভিভাবকদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সন্তানকে বাইরে পাঠানোর আগে এখন প্রতিটি বাবা-মা হয়তো একবার ভাববেন, জিপিএস ট্র্যাকার ছাড়া কি সন্তানকে আর নিরাপদে বড় করা সম্ভব? এই আতঙ্কই হয়তো অপ্রতিম হত্যার সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব।
মন্তব্য
0