পপ সংগীতের রাজা মাইকেল জ্যাকসন।
মারা গেছেন ২০০৯ সালে। কিন্তু তার গান, তার নাচ, তার ব্যক্তিত্ব — এখনো কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত। সেই মানুষটার জীবন নিয়ে এবার হলিউড তৈরি করেছে একটি বড় মুভি। নাম শুধুই — "MICHAEL"।গত ২৪ এপ্রিল ২০২৬ সালে সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছে এই মুভিটি। মুক্তির প্রথম দিন থেকেই বক্স অফিসে ঝড় তুলে দিয়েছে। আর সেই সাথে শুরু হয়েছে বিতর্কও।
কে বানিয়েছেন, কে অভিনয় করেছে
মুভিটি পরিচালনা করেছেন আন্তোয়ান ফুকোয়া। হলিউডে তার নাম বেশ পরিচিত। এর আগেও তিনি বেশ কয়েকটি সফল মুভি পরিচালনা করেছেন।
সবচেয়ে বড় চমক হলো মাইকেল জ্যাকসনের ভূমিকায় কে অভিনয় করেছেন সেটা।আসলে মাইকেলের চরিত্রে অভিনয় করেছে মাইকেল জ্যাকসনের আসল ভাতিজা জাফর জ্যাকসন এই মুভিতে তার চাচার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এটি জাফরের জীবনের প্রথম চলচ্চিত্র। যারা মুভিটি দেখেছেন তারা বলছেন জাফরের নাচ আর অভিনয় দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে যেন সত্যিকারের মাইকেলই মঞ্চে আছেন।
এছাড়া মুভিতে আরও অনেক পরিচিত মুখ আছেন। জো জ্যাকসনের ভূমিকায় কোলম্যান ডমিঙ্গো, ক্যাথরিন জ্যাকসনের ভূমিকায় নিয়া লং, বেরি গর্ডির ভূমিকায় লারেন্জ টেট এবং জন ব্রাঙ্কার ভূমিকায় মাইলস টেলার অভিনয় করেছেন।
- মুভিতে কী দেখানো হয়েছে
মুভিটি মাইকেল জ্যাকসনের পুরো জীবনের গল্প বলে না। শুধু তার ছোটবেলা থেকে শুরু করে ১৯৮৮ সালে "ব্যাড ট্যুর" পর্যন্ত সময়টুকু দেখানো হয়েছে।
ছোটবেলায় ইন্ডিয়ানায় জ্যাকসন পরিবারের কঠিন সংগ্রাম, বাবা জো জ্যাকসনের কঠোর শাসন, জ্যাকসন ফাইভের উত্থান, মোটাউন রেকর্ডসে সাইন করা, "অফ দ্য ওয়াল" অ্যালবাম, "থ্রিলার" ভিডিওর শুটিং এবং শেষে "ব্যাড ট্যুর" — এই পুরো যাত্রাটাই মুভিতে দেখানো হয়েছে।
মুভির শেষে লেখা আছে "His story continues" — যা ইঙ্গিত দিচ্ছে হয়তো সিক্যুয়েল আসতে পারে।
- বক্স অফিসে রেকর্ড
মুভিটি বক্স অফিসে রেকর্ড ভেঙেছে। মুক্তির প্রথম দিনেই আয় করেছে ৩৯.৫ মিলিয়ন ডলার। এই রেকর্ড আগে ছিল "অপেনহাইমার" মুভির। মানে যেকোনো বায়োগ্রাফিক্যাল মুভির ইতিহাসে এক দিনে এত বড় আয় আগে কখনো হয়নি।
প্রথম সপ্তাহান্তেই মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৯৭ মিলিয়ন ডলার। এটিও যেকোনো বায়োগ্রাফিক্যাল এবং মিউজিক্যাল মুভির ইতিহাসে সর্বোচ্চ ওপেনিং উইকেন্ড। শুধু আমেরিকায় নয়, ৮৩টি দেশে মুক্তি পেয়েছে মুভিটি এবং সব জায়গাতেই ভালো সাড়া পাচ্ছে।
- দর্শকরা কী বলছেন
মুভি দেখে বেরিয়ে দর্শকরা বলছেন জাফর জ্যাকসনের পারফরম্যান্স অসাধারণ। তার নাচ, গলার স্বর, এমনকি চলাফেরার ধরনও মাইকেলের মতো। মোটাউন ২৫ শো-তে মাইকেলের বিখ্যাত মুনওয়াক পারফরম্যান্সের দৃশ্যটা দেখে অনেক দর্শক আবেগ ধরে রাখতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।
একজন দর্শক লিখেছেন, এই বছরের সেরা মুভি। আরেকজন বলেছেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কিছু ভালো লেগেছে।
সমালোচকরা কী বলছেন
এখানেই মুভিটি বিতর্কে পড়েছে। সাধারণ দর্শক আর সমালোচকদের মতামতে বিশাল ফারাক।
রটেন টমেটোজে মাত্র ৩৭ শতাংশ সমালোচক মুভিটিকে ইতিবাচক রেটিং দিয়েছেন। মেটাক্রিটিকে স্কোর মাত্র ৩৯ এর ১০০।
সমালোচকদের প্রধান অভিযোগ দুটো। এক, মুভিটি মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে আসা শিশু নির্যাতনের অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে। দুই, মুভিটি অনেক বেশি "সাজানো গোছানো" এবং মাইকেলের জীবনের জটিল দিকগুলো দেখানো হয়নি।
একজন সমালোচক লিখেছেন মুভিটা দেখতে অনেকটা ক্রুজ শিপের বিনোদনের মতো — ভালো লাগে কিন্তু গভীরতা নেই। আরেকজন বলেছেন এটা মুভি না, একটা ফিল্ম করা প্লেলিস্ট।
তবে কেউ কেউ মুভির পক্ষেও কথা বলেছেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক বলেছেন এই মুভি ঠিক যা করার কথা তাই করেছে — একজন অসাধারণ শিল্পীকে উদযাপন করেছে। অ্যালভিস প্রেসলি বা এলটন জনের বায়োপিকেও তাদের বিতর্কিত দিক এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটা নিয়ে এত কথা হয়নি।
কেন শিশু নির্যাতনের অভিযোগ মুভিতে নেই
এটা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। আসলে মুভির মূল কাহিনি ১৯৮৮ সালেই শেষ হয়েছে, আর মাইকেলের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আসে তার পরে। তাই এই মুভিতে সেটা আসার সুযোগ ছিল না।
তবে পর্দার পেছনে আরেকটা কারণ আছে। জ্যাকসন এস্টেট এই মুভির প্রযোজক। এবং জর্ডান চ্যান্ডলারের সাথে করা একটি আইনি চুক্তির কারণে তাকে কোনো মুভিতে দেখানো বা উল্লেখ করা সম্ভব ছিল না। তাই মুভির পুরনো ভার্সন কেটে ছোট করতে হয়েছে।
মুভির আসল দৈর্ঘ্য কত ছিল
এটা অনেকেই জানেন না। মুভিটির মূল কাট ছিল চার ঘণ্টার। পরে সেটা কেটে ছোট করে ২ ঘণ্টা ১০ মিনিটে নামিয়ে আনা হয়েছে। মানে প্রায় দুই ঘণ্টার দৃশ্য বাদ দিতে হয়েছে।
- সিক্যুয়েল কি আসবে
লায়ন্সগেটের চেয়ারম্যান বলেছেন সিক্যুয়েল হবে কিনা সেটা নির্ভর করবে এই মুভির ব্যবসায়িক সাফল্যের উপর। বক্স অফিসের হিসাবে মুভি এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত চলছে। তাই সিক্যুয়েল আসার সম্ভাবনা বেশ ভালো।
সিক্যুয়েল হলে সেটা সম্ভবত ১৯৮৮ সাল থেকে শুরু হবে এবং মাইকেলের শেষ জীবন পর্যন্ত দেখাবে।
দেখবেন কিনা
যারা মাইকেল জ্যাকসনের ভক্ত তাদের জন্য এই মুভি একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা হবে। জাফর জ্যাকসনের পারফরম্যান্স একাই মুভিটি দেখার যোগ্য। থ্রিলার ভিডিওর শুটিং, মুনওয়াকের দৃশ্য, ব্যাড ট্যুরের কনসার্ট — এই মুহূর্তগুলো পর্দায় দেখা একটা আলাদা অনুভূতি।
তবে যারা মাইকেলের জীবনের পুরো গল্প জানতে চান — ভালো আর খারাপ সব মিলিয়ে — তাদের হয়তো মুভিটা একটু অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে।
সব মিলিয়ে মুভিটি এখন পর্যন্ত ২০২৬ সালের সবচেয়ে আলোচিত মুভিগুলোর একটি।
মন্তব্য
0