রাজশাহীর একটা ছোট্ট গ্রাম। নাম বলব না, কারণ এই গল্প শুধু সেই গ্রামের না, এই গল্প বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের।

আজিজুল হক। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সারাজীবন রিকশা চালিয়েছেন। রোদে পুড়েছেন, বৃষ্টিতে ভিজেছেন। দিনে যা আয় হতো তা দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলত। তিন ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে রাকিব।

  • রাকিব ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা ছিল। পড়াশোনায় মনোযোগ ছিল অসাধারণ। রাতে কারেন্ট চলে গেলে হারিকেনের আলোয় পড়ত। পরীক্ষায় সবসময় প্রথম। মাস্টারমশাই বলতেন এই ছেলে একদিন বড় হবে।

কিন্তু বড় হওয়ার পথে বাধা আসে।

যেদিন সব স্বপ্ন ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো

এসএসসিতে গোল্ডেন এ-প্লাস পেল রাকিব। পুরো এলাকায় সাড়া পড়ে গেল। আজিজুল সাহেব সেদিন রিকশা নিয়ে বের হননি। বাড়িতে বসে ছেলের রেজাল্টের কাগজটা বারবার দেখছিলেন। চোখ ভিজে আসছিল।

কিন্তু রাতে যখন হিসাব করলেন, বুকটা ভারী হয়ে গেল। কলেজে ভর্তি, বই, যাতায়াত — শুধু প্রথম বছরেই লাগবে প্রায় বিশ হাজার টাকা। রিকশা চালিয়ে মাসে আয় হয় চার থেকে পাঁচ হাজার। সংসার চালাতেই শেষ।

  • সেই রাতে বাবা-ছেলে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। কেউ কিছু বলেননি। কিন্তু দুজনেই বুঝতে পারছিলেন কী হতে পারে।
  • রাকিব সেই রাতে ঘুমায়নি। ভোরবেলা উঠে বাবাকে বলল — "আব্বা, আমি পড়ব। যেভাবেই হোক পড়ব।"

যেভাবে লড়াই শুরু হলো

কলেজে ভর্তি হলো রাকিব। টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু সে স্কুলের ছোট ভাইদের পড়াত। মাসে তিন-চারশো টাকা পেত। সেটা দিয়ে নিজের বই কিনত।

আজিজুল সাহেব রাতেও রিকশা চালাতে শুরু করলেন। বয়স হচ্ছে, শরীর টানছে না। কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থামতে পারতেন না।

এইচএসসিতেও গোল্ডেন এ-প্লাস। এবার মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন। কিন্তু মেডিকেল ভর্তি কোচিং ছাড়া প্রায় অসম্ভব। কোচিংয়ের খরচ কমপক্ষে পঞ্চাশ হাজার টাকা।

আজিজুল সাহেব সেবার জমির একটা অংশ বিক্রি করে দিলেন। পাড়ার মানুষ বলল, পাগলামি করছেন। রিকশাওয়ালার ছেলে কি ডাক্তার হয়? আজিজুল সাহেব কিছু বললেন না। শুধু একটু হাসলেন।

সেই মুহূর্ত যেটা সব বদলে দিল

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার দিন সকালে আজিজুল সাহেব ছেলেকে রিকশায় করে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে গেলেন। নিজে রিকশা চালিয়ে। রাস্তায় কেউ কেউ হাসল। রিকশাওয়ালা বাপ ছেলেকে মেডিকেল পরীক্ষায় নিয়ে যাচ্ছে।

রাকিব রিকশা থেকে নামার সময় বাবার হাত ধরল। বলল কিছু না। শুধু একবার পেছনে তাকাল।

সেদিন রাকিব পরীক্ষা দিল। আর তিন সপ্তাহ পর রেজাল্ট বের হলো। সারাদেশে মেধা তালিকায় রাকিবের নাম। রাজশাহী মেডিকেল কলেজে চান্স।

আজিজুল সাহেব খবরটা শুনে কী করেছিলেন জানেন? রিকশা রাস্তায় রেখে বসে পড়েছিলেন। কাঁদছিলেন। পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষগুলো থামল। জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে। তিনি বললেন — "আমার ছেলে ডাক্তার হবে।"

পাঁচ বছর পর

গত মাসে রাকিব তার এমবিবিএস ডিগ্রি পেয়েছে। প্রথম মাসের বেতন দিয়ে বাবার জন্য একটা নতুন রিকশা কিনে দিয়েছে। আজিজুল সাহেব সেই রিকশায় আর চড়েননি। শুধু হাত বুলিয়েছেন।

রাকিব এখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করছে। যে গ্রামের মানুষগুলো একসময় বলেছিল রিকশাওয়ালার ছেলে ডাক্তার হয় না, সেই গ্রামের মানুষগুলোই এখন রাকিবের কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন।

এই গল্প থেকে যা শেখার আছে

রাকিবের গল্পে কোনো অলৌকিক ঘটনা নেই। কোনো ধনী আত্মীয় হঠাৎ টাকা দেননি। কোনো লটারি জেতেনি। শুধু ছিল একটা স্বপ্ন আর সেই স্বপ্নের পেছনে দুইজন মানুষের অদম্য লড়াই।

বাবা লড়েছেন রাতের অন্ধকারে রিকশা চালিয়ে। ছেলে লড়েছে হারিকেনের আলোয় বই পড়ে।

আপনার জীবনেও হয়তো এরকম কোনো স্বপ্ন আছে। হয়তো মনে হচ্ছে পথ নেই, সম্ভব না। কিন্তু রাকিবের কথা মনে করুন। সে থামেনি। তার বাবা থামেননি।

আপনিও থামবেন না।

কারণ স্বপ্ন দেখার অধিকার শুধু ধনীদের না। স্বপ্ন পূরণের সুযোগও শুধু ধনীদের না। শুধু দরকার একটু সাহস আর একটু জেদ।

বাকিটা ঠিকই হয়ে যায়।

অন্যদের থেকে নিজেকে কখনো ছোট ভাববেন না আপনার  যেমন দক্ষতা রয়েছে সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আপনি চাইলে অনেক কিছু করতে পারেন তবে তার জন্য হয়তো অনেক বেশি অথবা কম কষ্ট করতে হবে। 

এর সাথে কাজে লাগবে আপনার মনোভাব এবং আপনার ইচ্ছাশক্তি যা আপনাকে আগের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে দিবে।