আপনারা যারা এই বাংলার মাটিতে আছেন তারা অনেকেই জানেনই না বর্তমানে সরকার থেকে পাওয়া অনেক ধরনের সহযোগিতা সম্পর্কে যার অধিকার আপনার ও রয়েছে কিন্তু আপনার এটা সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই। 

কথাটা শুনতে একটু অদ্ভুত লাগবে, কিন্তু এটাই সত্যি। এই দেশে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন যাদের সরকারি ভাতা পাওয়ার পুরো অধিকার আছে, কিন্তু পাচ্ছেন না। 

কারণ একটাই — জানেন না।

 পাশের বাড়ির বৃদ্ধ মানুষটা জানেন না যে তার বয়স্ক ভাতা পাওয়ার কথা। স্বামী হারানো যে মহিলাটা একা একা সংসার টানছেন খুবই কস্টে, তিনি জানেন না সরকার তাকে প্রতি মাসে সাহায্য করার কথা।

অনেক প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবারাও জানেন না যে ছেলের জন্য ভাতা আর বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যাবস্থা করা আছে।

এই লেখাগুলে ঠিক সেই মানুষগুলোর জন্য। যারা হাল ছেড়ে দিয়েছেন, যারা মনে করেন সরকারি সুবিধা মানেই নেতাদের তদবির লাগে, বড়লোকদের জন্য। এই ধারণাটা ভুল, এবং এই লেখা পড়লে সেটা বুঝতে পারবেন।

  • বয়স্ক ভাতা

বাংলাদেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সের যেকোনো দরিদ্র নাগরিক প্রতি মাসে সরকারি বয়স্ক ভাতা পান। এখন এই ভাতার পরিমাণ মাসে ৬০০ টাকা। কম শোনাচ্ছে? হয়তো। কিন্তু গ্রামের একজন একা বৃদ্ধের কাছে এই টাকাটা অনেক কিছু।

কীভাবে পাবেন — নিজের এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে একদিন যান। সাথে নিন জাতীয় পরিচয়পত্র আর একটা ছবি। 

চেয়ারম্যান বা সচিব বাকিটা বুঝিয়ে দেবেন। আবেদন মঞ্জুর হলে সরাসরি মোবাইলে টাকা আসবে, কারও কাছে হাত পাততে হবে না।

আপনার পাড়ায় যদি এমন কেউ থাকেন যিনি এই ভাতা পাচ্ছেন না, একটু সময় করে তাকে নিয়ে যান। একটা বিকেলের সময় দিলে তার বাকি জীবনটা একটু সহজ হয়ে যাবে।

  • বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা

স্বামী মারা গেছেন বা ছেড়ে চলে গেছেন, সংসার চলছে না যাদের ঠিকমতো — এই কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা নারীদের জন্য সরকার প্রতি মাসে ৬০০ টাকা ভাতা দিয়ে থাকে। আবেদনের জায়গা একই, ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা।

আশেপাশে এমন অনেক মা আছেন যারা এই কথাটা জানেন না। তারা ভাবেন সরকারি সুবিধা পেতে হলে নেতার সাথে যোগাযোগ লাগে। আসলে লাগে না। শুধু সঠিক কাগজপত্র নিয়ে একবার যেতে হবে।

  • তারপর প্রতিবন্ধী ভাতা

এই সুবিধার কথা সবচেয়ে কম মানুষ জানেন। দেশে নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রতি মাসে ৭৫০ টাকা ভাতা পান। শুধু টাকা না, সাথে পাওয়া যায় বিনামূল্যে চিকিৎসা, পড়াশোনায় বিশেষ সুবিধা আর সরকারি চাকরিতে কোটার সুবিধা।

এর জন্য আগে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র বানাতে হবে। কাছের জেলা বা উপজেলা সমাজসেবা অফিসে যান, ডাক্তারের সনদ আর জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যান। আবেদন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

পরিবারে কেউ প্রতিবন্ধী থাকলে এই সুবিধাটা নেওয়া দরকার। অনেক পরিবার না জেনে বা লজ্জায় এই সুযোগ হাতছাড়া করেন, যেটা আসলে একদমই উচিত না।

  • মাতৃত্বকালীন ভাতা

দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী মা প্রতি মাসে ৮০০ টাকা করে পুরো দুই বছর পাবেন। মোট ১৯,২০০ টাকা। একটা গরিব পরিবারের জন্য এটা কিন্তু কম না।

তবে একটাই শর্ত। গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে। এরপর আর সুযোগ থাকে না। তাই পরিবারে বা পাড়ায় কেউ গর্ভবতী হলে দেরি না করে এখনই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে বা কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়ে যান।

বিনামূল্যে আইনি সহায়তা

জমি দখল হয়ে গেছে, বেতন পাচ্ছেন না, স্বামী মারধর করছে — কিন্তু আইনজীবীর ফি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। এই পরিস্থিতিতে অনেকে ভাবেন আর কিছু করার নেই। আসলে আছে।

জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা দরিদ্র মানুষদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আইনজীবী দেয়। শুধু ফোন করুন ১৬৪৩০ নম্বরে। অথবা সরাসরি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে চলে যান। জমির বিরোধ, পারিবারিক সমস্যা, শ্রমিকের অধিকার — সব ধরনের বিষয়ে সাহায্য পাবেন।

  • কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে সার ও বীজ

যারা জমিতে চাষ করেন তারা সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচি থেকে বিনামূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে সার, বীজ আর কীটনাশক পেতে পারেন। এর জন্য উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কৃষক কার্ড বানাতে হবে।

এই কার্ড থাকলে শুধু সার-বীজ না, বন্যা বা খরায় ফসল নষ্ট হলে সরকারি ক্ষতিপূরণও পাওয়া যায়। অনেক কৃষক এই কার্ড না বানানোর কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে সরকারি সাহায্য থেকে বঞ্চিত হন।

শিক্ষা উপবৃত্তি

প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা সরকারি উপবৃত্তি পাওয়ার যোগ্য। প্রাথমিকে মাসে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা, মাধ্যমিকে আরও বেশি। স্কুলের শিক্ষকের সাথে কথা বলুন, তিনি বিস্তারিত জানাবেন।

অনেক পরিবার এই উপবৃত্তির কথা না জানায় সন্তানকে পড়াতে পারছেন না, অথচ সুযোগটা সামনেই ছিল।

শেষে একটাই কথা

এই লেখায় যা বললাম সেগুলো দয়া না, এগুলো আপনার অধিকার। আপনার ট্যাক্সের টাকায় এই ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি তথ্য না জানেন তাহলে অধিকার আদায় হয় না।

তাই শুধু নিজে পড়লে হবে না। মা-বাবাকে বলুন। গ্রামে ফোন করুন। ফেসবুকে শেয়ার করুন। একটা শেয়ার সত্যিই একটা পরিবারের জীবন বদলে দিতে পারে।

জরুরি নম্বর মোবাইলে সেভ করে রাখুন

স্বাস্থ্য সেবা: ১৬৭৬৭

বিনামূল্যে আইনি সহায়তা: ১৬৪৩০

কৃষি সহায়তা: ১৬১২৩

জাতীয় হেল্পলাইন: ৩৩৩


সূত্র: সমাজসেবা অধিদপ্তর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা, বাংলাদেশ।

এই লেখাটা উপকারী মনে হলে একজনকে হলেও শেয়ার করুন। একজন মানুষের কাজে লাগলেই লেখাটা সার্থক।