ফোনের স্ক্রিনে একটা ভিডিও দেখলেন।
একজন বৃদ্ধ মানুষ রাস্তায় বসে কাঁদছেন। তার অটোভ্যান ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। আশেপাশে অনেক মানুষ, কেউ থামাতে পারেনি। ভিডিওটা দেখে বুকের ভেতরে একটা অস্বস্তি তৈরি হলো। তারপর স্ক্রল করলেন। আরেকটা ভিডিও। আরও একটা।
এটাই এখন বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ার চিত্র। প্রতিদিন একের পর এক অপরাধের ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে। মানুষ দেখছেন, ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তারপর ভুলে যাচ্ছেন। কিন্তু আতঙ্কটা থেকে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক যে ঘটনাগুলো নাড়া দিয়েছে
এই বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
- মার্চ মাসে একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ঘটনাটি হলো — আকালু মিয়া নামের এক বৃদ্ধ অটোভ্যান চালকের গাড়িতে যাত্রী সেজে একজন ওঠেন। নামাপাড়া এলাকায় পৌঁছানোর পর চালককে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যান ছিনতাইকারী। এরপর সেই বৃদ্ধ চালক মাটিতে গড়াগড়ি করে আহাজারি করতে থাকেন। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ পায়। (Dailymotion)
- ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামে আরও ভয়াবহ একটি ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা থাকার পরও এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে সন্ত্রাসীরা দ্বিতীয় দফায় গুলি চালায়। ছয় থেকে সাত রাউন্ড গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। (TikTok)
- মার্চের শেষ দিকে সিলেটের গোয়াইনঘাটে সরকারি ভূমি অফিসের ভেতরে দরজা বন্ধ করে মারামারির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা ও অফিস সহায়কের মধ্যে মারামারির দৃশ্য ধারণ করা হয়। (TikTok)
- এপ্রিলের শেষে রাতে একটি মিছিলের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সকালে পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করে। (TikTok)
সাধারণ মানুষ কী ভাবছেন
ঢাকার মিরপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন রাহেলা বেগম। প্রতিদিন অফিস যাতায়াত করেন একা। তিনি বলেন, "আগে ভয় কম ছিল। এখন ফোনে ভিডিও দেখি আর ভাবি — কাল আমার সাথেও এরকম হতে পারে।"
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী করিম সাহেব বলেন, সন্ত্রাসীরা পুলিশ থাকতেও গুলি করছে। এরপর আর কীসের ভরসা?
এই অনুভূতি এখন শুধু এই দুইজনের না। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক — সব জায়গায় মানুষ প্রতিদিন এই ধরনের ভিডিও দেখছেন এবং একই প্রশ্ন করছেন — নিরাপত্তা কোথায়?
- ভিডিও ভাইরাল হওয়া কি সমাধান দিচ্ছে?
একটা প্রশ্ন অনেকের মনে আসে। ভিডিও ভাইরাল হলে কি আসলে কিছু হয়? কিছু ক্ষেত্রে হয়। বৃদ্ধ অটোচালকের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ নড়েচড়ে বসেছিল। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভিডিও ভাইরাল হয়, কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর সব শেষ। অপরাধী ধরা পড়ে না, বিচার হয় না।
বরং ভিডিও ভাইরাল হওয়ার একটা নেতিবাচক দিকও আছে। অপরাধীরা দেখছে যে প্রকাশ্যে অপরাধ করে ভিডিও ভাইরাল হলেও তাদের তেমন কিছু হচ্ছে না। এটা তাদের আরও সাহসী করে তুলছে।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ভিডিও দেখে দেখে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন যে অনেক সময় ঘটনাস্থলে সাহায্য না করে শুধু ভিডিও করেন। এটাও একটা বড় সামাজিক সমস্যা।
সমস্যার গভীরে কী আছে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় অপরাধের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পেছনে কয়েকটা কারণ আছে।
- প্রথমত, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে এখন যেকোনো ঘটনাই তাৎক্ষণিকভাবে রেকর্ড হয়ে যায়। আগে যে অপরাধগুলো ঘটত কিন্তু কেউ জানত না, সেগুলো এখন মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
- দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি কমে গেছে অনেক এলাকায়। অপরাধীরা এটা বুঝে গেছে।
- তৃতীয়ত, বিচার প্রক্রিয়া ধীর। অপরাধ করলে দ্রুত বিচার হবে এই ভয়টা কমে গেছে।
- কী করবেন আপনি
ভিডিও দেখলেই শেয়ার না করে থানায় অথবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করুন। ঘটনাস্থলে থাকলে আগে সাহায্য করুন, পরে ভিডিও করুন। নিজের এলাকার পরিচিত মানুষদের সাথে মিলে একটা সতর্ক নেটওয়ার্ক তৈরি করুন। অপরিচিত কারো গাড়িতে একা উঠবেন না, বিশেষত রাতে।
শেষ কথা
প্রকাশ্যে অপরাধের ভিডিও ভাইরাল হওয়া একটা সমাজের জন্য সুখকর বিষয় নয়। এটা আসলে একটা আয়না — যেটায় আমাদের আইনশৃঙ্খলার ভঙ্গুর চিত্র দেখা যাচ্ছে। শুধু ভিডিও দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করলে হবে না। প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হবে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নাহলে ভিডিও ভাইরাল হতেই থাকবে, আর সাধারণ মানুষের আতঙ্ক বাড়তেই থাকবে।
মন্তব্য
0